শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ১১:০১ পূর্বাহ্ন
◾মো: জোবায়ের ▪️ লেখক ও কলামিস্ট
মা–কুকুরের গগনবিদারী আর্তনাদ: মানুষের নামে আজ কী লাঞ্ছনা বহন করি আমরা!ছবিটি চোখে পড়তেই ভেতরটা কেঁপে ওঠে।মানুষ বলেই কি আমরা এত নিষ্ঠুর হতে পেরেছি?এমন দৃশ্য দেখে মনে হয়—মানুষের দেহখানায় যে হৃদয় থাকে বলে বইয়ে লেখা আছে, তা কি সত্যিই আছে? নাকি কেবল মাংসের এক টুকরো, যেখানে আর কোনো স্পন্দন নেই—কোনো অশ্রু নেই, কোনো অনুভব নেই?
ঈশ্বরদীর সেই ঘটনাটি আমাদের জাতির বিবেককে আরেকবার চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল। বস্তায় ভরে ছোট ছোট নিষ্পাপ কুকুরছানাগুলোকে পুকুরে ডুবিয়ে হত্যা—এ কোনো অপরাধ নয়, এ কোনো ভুল নয়—এ অপরাধেরও অনেক ওপরে এক অন্ধকার নিষ্ঠুরতা,যা নজরুলের ভাষায়,মানুষের রূপে পশুর চেয়েও হিংস্র এক দানবের বাস।মা–কুকুরটি সন্তান হারিয়ে যে আর্তনাদ করছিল—সেটা কেবল এক প্রাণীর আর্তনাদ নয়।সেটি ছিল মাতৃত্বের বিদীর্ণ কান্না।সেটি ছিল প্রকৃতির বুকফাটা শোক।সেটি ছিল সৃষ্টিকর্তার সামনে মানুষের দিকেই তোলা এক প্রশ্ন— তোমরা মানুষ? নাকি কেবল দেহে জন্ম নিয়েছো, মনটাও কি আদৌ জন্মেছে?
রবীন্দ্রনাথ শিখা-এ বলেছিলেন—অন্যায়ের উপর যে নীরব, সে অন্যায়কারীর চেয়েও ভয়ংকর।আজ মনে হচ্ছে—আমরা সেই ভয়ংকর নীরবতার যাত্রী।এই কুকুরছানাগুলোর অপরাধ কী ছিল?তারা কি মানুষের ঘর ভাঙতে গিয়েছিল?তারা কি দুর্নীতি করেছে?তারা কি অন্যের জীবন কেড়ে নিয়েছে?না—তারা শুধু পৃথিবীতে বাঁচতে চেয়েছিল।এই মাটির একটা কোণে একটু রোদে গা এলিয়ে দিতে চেয়েছিল।ভোরের প্রথম শিশিরে দৌড়ে বেড়াতে চেয়েছিল। মা–এর গায়ে মাথা রেখে একটু উষ্ণতা খুঁজেছিল।
অপরাধ—এইতটুকুই।সেই নিষ্পাপ প্রাণগুলোকে বস্তায় ভরে পুকুরের গভীরে ঠেলে দেয়ার সময়—মানুষের হাত কি কাঁপেনি?চোখ কি অন্ধ হয়ে গিয়েছিল?মস্তিষ্ক কি থেমে গিয়েছিল?নাকি আমরা এমন এক জাতি হয়ে গেছি—যেখানে নিষ্ঠুরতাকে অপরাধ মনে হয় না,বরং ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ মনে হয়?ঈশ্বরদীর সেই হত্যাকারীকে পুলিশ আটক করেছে—এটা ভালো।কিন্তু বিচার হবে?হবে কি?আমরা কি সত্যিই অপরাধ দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলেই থেমে যাব,নাকি একদিন সত্যিকারের ন্যায়ের পথও দেখব?
মানুষের নিকৃষ্টতার ইতিহাসে আরেকটি নির্মম অধ্যায়,মানুষ একসময় গুহায় থাকত, আগুন ছিল না, ভাষা ছিল না। তবু সে তখনো সন্তানহারা মায়ের কান্নার অর্থ বুঝত।ঈগলের ছানাকে ঝোপ থেকে পড়ে থাকতে দেখলে তুলে বাসায় রেখে আসত।মানুষ তখনও মানুষ ছিল।আজ?আজ আমরা সভ্যতার নামে যে পতাকা হাতে নিয়েছি—সেই হাতে বাচ্চা কুকুর হত্যা হয়।মানুষের মুখে আজ হাজারো কথার ভাষা—কিন্তু হৃদয়ে করুণা নেই, দয়ার আলো নেই।রবীন্দ্রনাথ কাঁদবেন আজ—তিনি বলেছিলেন,(দয়া না থাকিলে ধর্ম থাকে না) আজকের মানুষ ধর্মের কথা মুখে বলে,আর নিষ্ঠুরতা বানায় আচারের নিয়ম।মা–কুকুরের আর্তনাদ: মানুষের বিবেকের বিচারমঞ্চ,যে মা–কুকুরটি ছুটে ছুটে নিজের সন্তান খুঁজছিল—তার ডাকে ছিল জগতের প্রাচীনতম ব্যথা।সেই ব্যথা মানুষের মায়ের ব্যথার চেয়ে কম ছিল না,কেবল সে কথা আমরা শুনতে চাই না। মানুষের দম্ভ আমাদের বধির করে দিয়েছে।যদি মানুষ সত্যিই মানুষ হতো—তবে সে মুহূর্তে ঈশ্বরদীর আকাশও কাঁদত,বাতাসে উঠে আসত নীরব হাহাকার। কিন্তু মানুষের হৃদয় এতটাই শক্ত হয়ে গেছে যে পাশ কাটিয়ে চলে গেছে সে নরহত্যার মতো নিষ্ঠুরতাও।এই লজ্জার দায় আমাদেরই,হ্যাঁ, হত্যাকারী একজন—কিন্তু লজ্জার বোঝা বহন করবে পুরো জাতি।কারণ মানুষ হিসেবে আমরা ব্যর্থ, সমাজ হিসেবে আমরা ব্যর্থ, মানবতা রক্ষার প্রতিজ্ঞায় আমরা ব্যর্থ।আমরা বড় বড় স্লোগান দিই,মানবতার কথা বলি,প্রকৃতির অধিকারের কথা বলি,পশুপাখি রক্ষার কথা বলি—কিন্তু কোথায় সেই মানবতা,কোথায় সেই সুরক্ষা?শুধু কাগজে।শুধু বক্তৃতায়।শুধু নামমাত্র সভ্যতায়।একটু ভালোবাসাই পারে পৃথিবী বদলে দিতে,এক শিশু যখন প্রথম পৃথিবীতে আসে, মা–এর বুকের দুধ তার প্রথম আহার,আর প্রাণীর বাচ্চার প্রথম শিক্ষা—মায়ের চুমুক, মায়ের স্পর্শ, মায়ের নিঃশ্বাস।এই পৃথিবী ভালোবাসার ওপর দাঁড়িয়ে আছে—অন্যায়, প্রতিহিংসা, নিষ্ঠুরতা নয়।কিন্তু মানুষ সেই মূল শক্তিটাকেই ভুলে গেছে।এই কুকুরছানাগুলোকে যদি কেউ সামান্য পানি দিত,সামান্য খাবার দিত,একটু নিরাপত্তার জায়গা দিত—তারা বাঁচত,তারা হাসত,তারা পৃথিবীকে ভালোবাসার মাধ্যমে সাজিয়ে যেত।
আমরা কি এতই নিষ্ঠুর হয়ে গেছি?প্রশ্নটা আজ সবাইকে করতে হবে।আজকে কুকুরছানা,কালকে হয়তো আরেক প্রাণী,পরশু হয়তো মানুষ—নিষ্ঠুরতার ধারাবাহিকতা এমনই।
নৃশংসতার হাত একবার খুললে সেটিকে থামানো যায় না।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন—(মানুষ তার মহিমা হারাইলে পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট হইয়া পড়ে)আমরা কি আজ সেই নিকৃষ্টতার সীমা অতিক্রম করলাম?বিচার চাই—শুধু আইনের নয়, নৈতিকতারও,ঈশ্বরদীতে যিনি এই বর্বরতা ঘটিয়েছেন—তার বিচার অবশ্যই হতে হবে। কিন্তু বিচার শুধু আদালতের নয়—বিচার আমাদের নিজেদেরও করতে হবে।আমরা কেমন মানুষ?আমাদের হৃদয়ে কতটুকু আলো আছে?আমরা কি সত্যিই মানবিক?নাকি কেবল আধুনিকতার মোড়কে প্রাচীন বর্বরতার মুখোশ পরে আছি?এই কান্নার দায় আমাদের সকলের,এই কুকুরছানাগুলোর মৃত্যু একটি সমাজের মানবিকতা–পরীক্ষার সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন।এই প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা বেশিরভাগই পরাজিত।মানুষ হয়েও যদি মানুষ হতে না পারি—তবে সভ্যতার মানচিত্রে আমাদের স্থান কোথায়?আসুন,আজ অন্তত নিজের মনকে একবার জিজ্ঞেস করি—আমি কি মানুষ? নাকি নিষ্ঠুরতার ছায়ায় ঢাকা এক ক্ষয়িষ্ণু সত্তা?এই পৃথিবী আমাদের ওপর ভরসা রেখেছে—পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণও আমাদের ওপর ভরসা রেখেছে।সেই ভরসা ভেঙে দেওয়া আমাদের কোনো অধিকার নেই।