রবিবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২৬, ০৪:২৭ অপরাহ্ন
দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্বার্থে চট্টগ্রামকে একটি পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে সিটি গভর্মেন্ট (নগর সরকার) প্রতিষ্ঠা অত্যাবশ্যক বলে মন্তব্য করেছেন চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) চট্টগ্রাম কলেজ মিলনায়তনে বাংলাদেশ ইকোনোমিকস অলিম্পিয়াড ২০২৬-এর চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পর্বে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মেয়র এ মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, নগর সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে নগরের বিভিন্ন সেবা প্রদানকারী সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত হবে, ফলে উন্নয়ন কার্যক্রমের সুফল দ্রুত ও সহজে সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে।
প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে তিন শতাধিক শিক্ষার্থী তাদের অর্থনৈতিক জ্ঞান ও বিশ্লেষণী দক্ষতার পরিচয় দেয়।
অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মোহাম্মদ ইয়াহিয়া আখতার প্রধান বক্তা ছিলেন। সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ইকোনমিকস অলিম্পিয়াডের চেয়ারম্যান এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ সরকারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। মূল বক্তা ছিলেন পূবালী ব্যাংক পিএলসি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী।
বিশেষ অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ মোজাহিদুল ইসলাম চৌধুরী, চলচ্চিত্র নির্মাতা সাইদ খান সাগর এবং ব্রাক ব্যাংকের চট্টগ্রাম রিজিওনাল হেড কায়েস চৌধুরী। উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ইকোনমিকস অলিম্পিয়াডের অ্যাম্বাসেডর মো. মানসুরুল হক।
মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, অর্থনীতির শিক্ষা—দেশ গড়ার দীক্ষা’ এই প্রতিপাদ্য সামনে রেখে আয়োজিত এই অলিম্পিয়াড অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি উদ্যোগ। আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের নীতিনির্ধারক, উদ্যোক্তা ও অর্থনীতিবিদ।
তাদের মধ্যে অর্থনৈতিক চিন্তা ও বিশ্লেষণী দক্ষতা গড়ে তুলতে এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রামকে আমরা বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে দেখতে চাই। কিন্তু একটি শহরকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে কিছু মৌলিক কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক শর্ত পূরণ করতে হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো শক্তিশালী ও কার্যকর নগর সরকার।
আমি দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন থেকেই সিটি গভর্মেন্ট প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছি।
চট্টগ্রামে উন্নয়ন হয়েছে, কিন্তু তা খণ্ডিত ও সমন্বয়হীন। এর মূল কারণ হলো নগরের সেবা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এক ছাদের নিচে না থাকা। ফলে পরিকল্পিত ও সমন্বিত নগর উন্নয়ন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।
বিশ্বের উন্নত নগরগুলোর উদাহরণ টেনে মেয়র বলেন, লন্ডন, টরন্টো কিংবা অন্যান্য উন্নত শহরগুলো কেন এত পরিকল্পিত ও অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে—তার মূল কারণ হলো শক্তিশালী সিটি গভর্মেন্ট ব্যবস্থা। নগর সরকারের অধীনে সব সেবা সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করায় তারা দ্রুত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারছে।
নগর ব্যবস্থাপনার বাস্তব চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম নগরীতে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ২০০ মেট্রিক টন বর্জ্য উৎপন্ন হলেও আমরা সংগ্রহ করতে পারছি প্রায় ২ হাজার ২০০ মেট্রিক টন। বাকি বর্জ্য খাল, নালা ও পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ছে, যা নগরের অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
এই বর্জ্যই সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব। আমরা ইতোমধ্যে বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদনের সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু করেছি। হালিশহরে কোরিয়ান একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে বায়োগ্যাস প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডি চলছে। পাশাপাশি গ্রিন ডিজেল উৎপাদনের জন্য যুক্তরাজ্যের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা অগ্রসর পর্যায়ে রয়েছে। কিন্তু এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে আমাদের বারবার বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দ্বারে দ্বারে যেতে হয়। যদি সিটি গভর্মেন্টের ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়, তাহলে খুব সহজেই এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হবে এবং নগরের অর্থনৈতিক চাকা আরও গতিশীল হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন কৃষি, গার্মেন্টস ও রেমিটেন্সের গণ্ডি পেরিয়ে নতুন খাত খোঁজার সময় এসেছে। চট্টগ্রামে পর্যটন, কার্বন ইন্ডাস্ট্রি, ফার্মাসিউটিক্যালস, মাইক্রোচিপ ও প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প গড়ে তোলার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। পরিকল্পিত নগর সরকার ছাড়া এসব সম্ভাবনা বাস্তবায়ন করা কঠিন। সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনা ও সিটি গভর্মেন্ট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যসম্মত, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ চট্টগ্রাম গড়ে তোলা সম্ভব। এর মাধ্যমেই চট্টগ্রামকে দেশের প্রকৃত বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যাবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মোহাম্মদ ইয়াহিয়া আখতার বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক একটি বিষয় নিয়েও যে এত সুন্দরভাবে তরুণদের মাঝে প্রতিযোগিতার আয়োজন করা যায় তা প্রমাণ করেছে বাংলাদেশ ইকোনমিকস অলিম্পিয়াড এর আয়োজকরা। তাদের ধন্যবাদ জানাই এ জন্য যে, এই প্রতিযোগিতা দেশকে এগিয়ে নিতে শিক্ষার্থীদের মাঝে আরো আগ্রহ ও জ্ঞানের প্রসার করবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ইকোনমিকস অলিম্পিয়াডের উত্তরোত্তর আগ্রহ সব জায়গায় বাড়ছে। ইকোনমিকসের দুইটা দিক, একটা সাব্জেক্টিভ, আরেকটা প্রায়োগিক। ইকোনমিকস অলিম্পিয়াড এর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো ইকোনমিকসের প্রায়োগিক দিক দিয়ে প্রত্যেক নাগরিককে সক্ষম করে তোলা।
পূবালী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও বাংলাদেশে ডিজিটাল কারেন্সির গুরুত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি বলেন, পৃথিবীটা খুব দ্রুত পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। আগামীর বিশ্ব প্রযুক্তি এবং অর্থনীতি নির্ভর। তাই পরিবর্তিত বিশ্বে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে প্রায়োগিক অর্থনীতি সম্বন্ধে তরুণ সমাজের আরো প্রসার করতে হবে এবং এই ধরনের ইকোনমিকস অলিম্পিয়াড এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছি।
১৭ জানুয়ারি দিনব্যাপী এই আয়োজনে তিন স্তরের ক্যাটাগরিতে শিক্ষার্থীরা অর্থনৈতিক জ্ঞান, বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা প্রদর্শন করে মেধার স্বাক্ষর রাখেন।
বাংলাদেশ ইকোনমিকস অলিম্পিয়াডের সভাপতি মো. আল-আমিন পারভেজ জানান, বাংলাদেশ ইকোনোমিকস অলিম্পিয়াড তরুণ শিক্ষার্থীদের মাঝে অর্থনৈতিক প্রয়াস ছড়িয়ে দিচ্ছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ইকোনমিকস অলিম্পিয়াডে থেকে নির্বাচিত টিম আন্তর্জাতিক ইকোনমিকস অলিম্পিয়াডে ৪টি পদক অর্জন করে। দায়িত্বশীল একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আমরা চাই সচেতন এবং অর্থনৈতিকভাবে জ্ঞানী সমাজ গড়ে তুলতে যাতে দেশের অর্থনীতিতে শিক্ষার্থীরা ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশ ইকোনমিকস অলিম্পিয়াডের অ্যাম্বাসেডর মো. মানসুরুল হক পরিচালিত ইন্টারেক্টিভ সেশনে শিক্ষার্থীরা তাদের প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার, বাস্তব জীবনের অর্থনৈতিক সমস্যা সম্পর্কে জানার এবং ক্যারিয়ার পরামর্শ পাওয়ার সুযোগ পায়।
পরীক্ষামূলক বাছাই পর্ব শেষে তিনটি ক্যাটাগরিতে শীর্ষ বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। জুনিয়র ক্যাটাগরিতে মোসা. সুমাইয়া ইসলাম, মো. আনিসুর রহমান এবং আদিত্য রাজন্না; ইন্টারমিডিয়েট বিভাগে মোহাম্মদ উহান্না মো. আলমান চৌধুরী এবং মো. সাদিক রাশিদ ধন্য এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য এডভান্স ক্যাটাগরিতে বিজয়ীরা হলেন— সাইয়রনা সোলাইমান সুবাহ, হুর-ই-জান্নাত এবং জয় গোপাল বণিক।